রবিবার-২১শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-৮ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-১২ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি

বাংলাদেশের বৌদ্ধধর্মের বিকাশে সদ্ধর্মগ্রাম আবুরখীলের ভূমিকা, ১ম পর্ব

লেখক :রাজেশ
বাংলাদেশের বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস খুবই সমৃদ্ধ। বৌদ্ধধর্ম এদেশের প্রাচীন ধর্ম এবং বুদ্ধের জীবদ্দশায় এটি এদেশে প্রচারিত হয়েছিল। বৌদ্ধদের ইতিহাসে যে ক্রান্তিকালে কয়েকজন ব্যক্তি বৌদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণে গৌরবময় ভূমিকা পালন করেছিলেন তন্মধ্যে দার্শনিক ডা.রামচন্দ্র রড়ুয়া, পন্ডিত ধর্মরাজ বড়ুয়া এবং কবি সর্বানন্দ বড়ুয়ার নাম আমি গৌরবের সাথে উল্লেখ করছি। তাদের সকলেরই জন্মস্থান আবুরখীল। তারা তাদের লেখনীর মাধ্যমে বৌদ্ধধর্মের আদর্শকে সমুন্নত রাখেন। ডা. রামচন্দ্র বড়ুয়া বিরচিত অভিধর্মার্থ সংগ্রহ হলো বাংলাভাষার প্রথম রচিত বৌদ্ধদর্শন সম্পর্কিত গ্রন্থ। সে সময় বৌদ্ধদের জন্য পালনীয় বিষয়ের কোন গ্রন্থ ছিল না। বৌদ্ধদের ধর্মকর্ম এবং জীবনযাত্রা, বন্দনা, পূৃজা -পার্বন, দান ইত্যাদির উপর প্রথম গ্রন্থ হস্তসার আজও সমান জনপ্রিয়তায় ভাস্বর। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এইগ্রন্থটি তার সাথে রাখতেন।
ঠিক তেমনিভাবে কবি সর্বানন্দ বড়ুয়া “জগজ্জ্যোতি “(বুদ্ধের জীবনী) প্রণয়ন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিলেন। তার জগজ্জ্যোতির পাণ্ডুলিপি দেখে মহাকবি নবীন সেন মন্তব্য করেছিলেন “সর্বানন্দ “! তুমি জগজ্জ্যোতি লিখবে জানলে আমি আমার অমিতাভ (বুদ্ধের জীবনী কাব্য) লিখতাম না। মহাকবির এই স্বীকৃতি সেদিন বৌদ্ধদের সম্মানিত করেছিল। উল্লেখ যে, ইংরেজ কবি বুদ্ধকে এশিয়ার আলো বলাতে – সর্বানন্দ জগজ্জ্যোতি লিখে প্রমাণ করেছিলেন যে মহামতি বুদ্ধ শুধু এশিয়ার আলো নন, তিনি জগতের আলো। অতএব দেখা যায় আধুনিক কালে বৌদ্ধধর্মের পূণর্জাগরণে আবুরখীলের অবদান গৌরবের। এছাড়া সংঘজীবন ধারণাটা শ্রদ্ধেয় মানিকচাঁদ মহাস্থবির ছিলেন রাজগুরু। সে সময়ে যে কয়জন বৌদ্ধ ভিক্ষু মনীষা ছিলেন তন্মধ্যে তিনি অন্যতম। আবুরখীলে অনেক ভিক্ষুর জন্ম হয়েছে। তিনি বাঙ্গলার শাক্যমুনি বিহারে ভিক্ষুসীমা প্রবর্তন করেছিলেন। অপরাপর কৃতি ভিক্ষু হলেন বঙ্গীশ স্থবির । তিনি ধর্ম শিক্ষা ছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন এবং বৃটিশ আমলে ডিসটিংশন নিয়ে বি. এ পাশ করেছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের অন্যতম রুপকার এবং প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব। তার হাত ধরেই কৃষ্টি প্রচার সংঘের প্রথম আবেদনপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরোর সাথে ১৯৫০ সালে শ্রীলংকায় অনুষ্টিত বিশ্ব বৌদ্ধ সম্মেলনে যোগদান করে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করেছিলেন যে, তৎকালীন পাকিস্তান বর্তমান বাংলাদেশে বৌদ্ধ আছে এবং এভাবেই বিশ্ব বৌদ্ধদের সাথে এদেশের বৌদ্ধদের প্রথম সংযোগ স্থাপিত হয়। তিনি সেদিন এদেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্য নিয়ে সম্মেলনে ভাষণ দিয়েছিলেন বলে আমাকে বলেছিলেন। বিশ্ব বলয়ে তিনি আমাদের অগ্রণী ব্যাক্তিত্ব। উক্ত সম্মেলনে তাদের সাথে প্রখ্যাত সমাজকর্মী বৌদ্ধনেতা উকিল উমেশচন্দ্র মুৎসুদ্দীও গিয়েছিলেন। বলা প্রয়োজন বৌদ্ধধর্ম ও দর্শন সম্পর্কে উচ্চতর জ্ঞানলাভের মানসে আবুরখীলের সূর্য সন্তান পন্ডিত ধর্মরাজ বড়ুয়া স্থলপথে থাইল্যান্ড গিয়েছিলেন।
দীর্ঘদিন ধরে সারাদেশে ধর্মসুধা বিতরণ করেছিলেন আবরখীলের আরেক কৃতি ভিক্ষু শ্রদ্ধেয় ধর্মপাল মহাথের (প্রকাশ সুরেশ ভন্তে)। তিনি ভিক্ষু মহাসভার অন্তবর্তীকালীন সংঘনায়ক ছিলেন। আরেক কৃতি ভিক্ষু হলেন ড.শাসনরক্ষিত ভিক্ষু। তিনি রাঙ্গুনিয়া কলেজে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালির অধ্যাপক ছিলেন। তিনি ভারতের পুনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি. এইচ. ডি করেছেন। তিনি একজন গ্রন্থ প্রণেতা এবং ঢাকার নারায়নগঞ্জস্থ ফতুল্লা য় বৌদ্ধ বিহারের প্রতিষ্ঠাতা। এই গ্রামে আরও অনেক ভিক্ষু আছেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংযোজন হলো আমার দাদুভান্তে শ্রদ্ধেয় রতনশ্রী মহাথের বর্তমানে সহ -উপ সংঘনায়ক। তিনি বর্তমানে সংঘজীবনে আবুরখীলের প্রতিনিধিত্ব করছেন।…….
তাছারা আমাদের আবুরখীল গ্রামের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটই বর্ণনা করা সমীচীন বলে মনে করি। কেননা আবুরখীলের পরিবেশ শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি হলো তার উত্থানের পশ্চাৎভূমি।
তাছারা বর্তমানে আবুরখীলের সমাজকর্মীরা অনেকেই আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন। শিক্ষকতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে, কলেজে…. এবং সরকারী চাকরিতে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছে। সামরিক বিভাগে এবং পুলিশ বিভাগে চাকুরী নিয়ে দক্ষতা দেখাতে সমর্থ হয়েছে। এছাড়া ব্যাংক, বীমা ও ব্যবসা প্রতিষ্টানের চাকুরীতে উচ্চপদে আসীন হয়েছে।
বীর্যবত্তার পরিচয় রেখেছে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে আবুরখীলের,, বিপ্লবীসন্তান রোহিনী বড়ুয়া ফাঁসির কাষ্ঠে জীবন বিসর্জন দিয়ে বীরত্বের প্রমাণ রেখেছেন। এছাড়া ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আবুরখীলের পুলিন বড়ুয়া, প্রফুল্ল কমল বড়ুয়া, প্রিয়দারঞ্জন বড়ুয়া খগেন্দ্রলাল বড়ুয়া, মাহিন্দ্র্র বড়ুয়া, জ্যোতিষ বড়ুয়া, আদিত্য বড়ুয়া, বিভূতি বড়ুয়া প্রমুখ ব্যক্তিরা অংশ নিয়েছিলেন। তাছারা এদের মধ্যে আমার শ্রদ্ধেয় জেঠু মানে আমার দাদুর আপন কাকা অন্যতম পুলীন বিহারী বড়ুয়া ছিলেন বৃটিশ যুগের স্বাাধীনতা সংগ্রামী এবং মাষ্ঠারদা সূর্যসেনের সূর্য সৈনিক। তিনি বিপ্লবী ছিলেন এবং কয়েকবার কারাবরণ ও করেছিলেন। পুলিশের অনেক নির্যাতন সহ্য করেছেন। তাছারা আমাদের পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন আমার শ্রদ্ধেয় দাদু সুধীর বড়ুয়া যিনি ই.টি. আর এ চাকরি করত এবং ময়মনসিংহ পাক হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধ করে এবং শহীদ হয়। পরে বাংলাদেশ সরকার তাকে মরনোত্তর বীর বিক্রম উপাধিতে ভূষিত করেন। এবং ময়মনসিংহে আমার দাদুর নামে একটি রাস্তার নামকরন হয় ।….
তাছারা আমাদের গ্রামে অনেকে বাংলাদেশ সরকারের গুরুপ্তপুণ গুরুপ্তপুণ মন্ত্রণালয়ের সরকারি কর্মকতা হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ১. তরুন বড়ুয়া (ICS)অব :রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান
২.অশোক বড়ুয়া, অব. গণপূর্ত মন্ত্র ণালয়ের চীফ ইঞ্জিনিয়ার।
৩. ড.প্রণব বড়ুয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ( পালি)
৪. ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া, চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ( পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান) একুশে পদক প্রাপ্ত
৫. ডা. উওম বড়ুয়া (শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক এবং বি এম এ কেন্দ্রিয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক)
৬.জিশু বড়ুয়া (সাবেক শিল্প ব্যাংকের পরিচালক)
৭. জ্যোতিষময় বড়ুয়া (সাবেক চিনি শিল্প করপোরেসনের চীফ ইঞ্জিনিয়ার)
৮. ড. রঞ্জিত বড়য়া (সাবেক চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের চেয়ারম্যান)
৯. রঞ্জিত বড়ুয়া (বাংলাদেশ কর্র উপ কমিশনার)……..
………
ধন্য আবুরখীল।
তথ্য সংযুক্তি :ড. প্রণব কুমার বড়ুয়া ও জেঠু ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়ার লিখিত বিভিন্ন বই থেকে
কৃতজ্ঞতা = বরন বড়ুয়া বাবু ।
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on telegram
Telegram
Share on skype
Skype